Sports News

[Content Marketing][recentmag]
Footer Logo

২০২১/০৭/১৩

Mahabharater Anubad Bangla Sahityer Itihas

  BAIRAGYA SHIKSHA NIKETAN       ২০২১/০৭/১৩

 বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস
মহাভারতের অনুবাদের ধারা
Mahabharater Anubad
Bangla Sahityer Itihas


Mahabharater Anubad Bangla Sahityer Itihas
Mahabharater Anubad Bangla Sahityer Itihas


ভারতের অমৃত আত্মা, জাতীয় জীবনের সমগ্র সত্তা, প্রান ও মনের ক্ষুধা ও সুধা সবই মহাভারতের চিরন্তন কাব্যধারায় স্নাত হয়েছে। সেই আদি যুগ থেকে রাম রাবণের যুদ্ধ বিবাদ সিংহলের সমুদ্রতটে শান্তি লাভ করেছে। কিন্তু কুরুবংশের ভ্রাতৃবিরোধ অনাগতকালের মানব সভ্যতা ও সমাজের জন্য আশা সান্ত্বনা ও আদর্শ সঞ্চয় করে রেখেছে মহাভারত। তাই মহাভারত তার নিজস্ব চরিত্রে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাচীন মহাকাব্য। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, "ইহা কোন ব্যক্তি বিশেষের রচিত ইতিহাস নহে, ইহা একটি জাতির স্বরচিত স্বাভাবিক ইতিহাস।" আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর বলেছেন, "মহাভারতে বর্ণিত ইতিহাস মানবসমাজে বিপ্লবের ইতিহাস"। তিনি মহাভারতকে ভারত সভ্যতার হিমালয় রূপে বর্ণনা করেছেন। এই একই কথার প্রতিধ্বনি করেছেন জার্মানির পন্ডিত সংস্কৃত সাহিত্য বিশারদ Winternitz, "Indeed in a certain sense the Mahabharata is not one poetic production at all but rather a whole literature." মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক কাশীরাম দাস বলেছেন, "মহাভারতের কথা অমৃত সমান"।


সেই অমৃত রসের সন্ধানে অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষাভাষীর মতো বাঙালিও মহাভারত অনুবাদ শুরু করেছিল মধ্যযুগে। বাংলাদেশে মহাভারত অনুবাদের সূচনা হয়েছিল পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে। মহাভারতের বিশাল আকারের জন্যই হোক, আর অন্য কারণেই হোক, পূর্ণাঙ্গ মহাভারতের অনুবাদ খুব অল্প হয়েছে। অনেকে জনপ্রিয় কাহিনীগুলির বা দু-একটি পর্বের অনুবাদ করেছেন মাত্র। 


মহাভারত অনুবাদকদের নাম সমস্যা:


ষোড়শ শতকের শেষদিকে আমরা প্রথম অনুবাদক হিসেবে চারজন কবির নাম পাই- কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, সঞ্জয় এবং বিজয় পন্ডিত। কিন্তু এদের রচনাকাল বা কবি পরিচিতি সম্পর্কে নানা মতভেদ আছে। উমেশচন্দ্র বটব্যাল প্রথম কবীন্দ্র পরমেশ্বর এর উল্লেখ করেছেন। এরপর নগেন্দ্রনাথ বসু বিজয়পণ্ডিতকে প্রথম অনুবাদক হিসেবে হাজির করেছেন। ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন সঞ্জয়কে প্রথম অনুবাদক বলেছেন। ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কবীন্দ্র পরমেশ্বর এবং শ্রীকর নন্দীকে অভিন্ন বলেছেন। মণীন্দ্রমোহন বসু বিজয় পণ্ডিতকে স্বীকার করেন না। ডক্টর সুকুমার সেন সঞ্জয় ও বিজয়পণ্ডিতকে অস্বীকার করেছেন। এত মতবিরোধিতার মধ্য থেকে সত্য প্রতিষ্ঠা প্রায় অসম্ভব। কারণ বহু পুঁথিতে লিপিকর বা গায়কের নাম আছে কবির নাম নাই। 


কবীন্দ্র পরমেশ্বর: পরাগলী মহাভারত:


কবীন্দ্র পরমেশ্বর সুলতান হোসেন শাহ ও তার পুত্র নসরৎ শাহের সময়ে চট্টগ্রামে মহাভারতের কিছু অংশের অনুবাদ করেছিলেন। তার কাব্যের নাম 'পাণ্ডববিজয়'। এখানে দুইজন সুলতানের নাম আছে। কাব্যটিকে অনেকে পরাগলী মহাভারত বলেছেন। কারণ চট্টগ্রামের প্রশাসক পরাগল খাঁ এবং তার পুত্র ছুটি খাঁ কবির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কবি তাঁর পৃষ্ঠপোষকদের নাম উল্লেখ করলেও নিজের সম্পর্কে কিছু বলেন নি। কেউ বলেন কবীন্দ্র তার উপাধি, আসল নাম শ্রীকর নন্দী। কেউ বলেন, কবীন্দ্র পরমেশ্বর তার উপাধি। কাব্যটির ভাষা সহজ সরল। কবির আদর্শ জৈমিনি মহাভারত ও ব্যাসদেবের মহাভারত। 


শ্রীকর নন্দী:


শ্রীকর নন্দী পরাগল খাঁর পুত্র ছুটি খাঁর সময়ে তার কাব্যটি লিখেছিলেন। তিনি যে পৃথক ব্যক্তি এ কথা অনেকে মানেন না। তার কাব্যে বিভিন্ন জনের নাম আছে। ভাষা সহজ সরল। কবির আদর্শ জৈমিনি মহাভারত ও ব্যাসদেবের মহাভারত। 


সঞ্জয়:


সঞ্জয় নামধারী এক মহাভারত অনুবাদকের নাম কোন কোন পুঁথিতে পাওয়া গেছে। তবে তিনি লেখক না লিপিকার তা জানা যায়নি। কবীন্দ্র পরমেশ্বর এর লেখার সঙ্গে তাঁর লেখার ছত্রে ছত্রে মিল আছে। তাই অনেকে তাকে আলাদা লেখক বলতে রাজি নয়। 


বিজয় পন্ডিত:


বিজয় পণ্ডিত সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য। তিনি লেখক না লিপিকার তা বোঝা কঠিন। কবীন্দ্র পরমেশ্বর এর রচনার সঙ্গে তার হুবহু মিল আছে।


এছাড়া ষোড়শ শতকে রামান্দ্র খাঁ, দ্বিজ রঘুনাথ মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বের অনুবাদ করেছিলেন। 


কাশীরাম দাস:


সপ্তদশ শতকে রচিত কাশীরাম দাসের মহাভারত অসাধারণ জনপ্রিয় হয়েছিল। কৃত্তিবাসকে বাদ দিলে সমগ্র মধ্যযুগে তিনি বাংলার জাতীয় কবি। এত সুচারুভাবে মহাকাব্যটিকে বাঙালির জাতীয় জীবনের সঙ্গে আর কেউ যুক্ত করতে পারেননি। সমগ্র ভারতবর্ষে কৃত্তিবাস, তুলসীদাস এবং কাশীরামের মত এত গভীর জনপ্রিয়তা ও জাতীয় গৌরব আর কোনো কবি পাননি। মহাভারতের মত সুবিস্তৃত, বহুবিচিত্র কাহিনী সম্বলিত একটি দুরূহ কাব্যকে বাংলার মতো একটি প্রাদেশিক ভাষায় অনুবাদ করা যথেষ্ট শক্তির পরিচায়ক। কবি কাশীরাম বাঙালির উপযোগী করে কাব্যটিকে ঢেলে সাজিয়েছেন। এমনকি বলা যেতে পারে, তিনি নতুন মহাভারত রচনা করেছেন। এই পুণ্য কর্মের জন্য মধুসূদন বলেছেন, "হে কাশী, কবীশ দলে তুমি পুণ্যবান"। 


কাশীরাম দাসের জন্ম ও কাব্য রচনাকাল:


কাশীরাম দাসের জন্ম পরিচয় ও জন্মকাল নিয়ে মতভেদ আছে। নিজের সম্পর্কে তিনি বিশেষ কিছু বলে যাননি। তার বংশের অনেকে কবিত্ব শক্তির অধিকারী ছিলেন। বর্ধমান জেলার কাটোয়ার কাছে সিঙ্গি গ্রামে তার জন্ম। দু'একটি পুঁথিতে পাওয়া সাল তারিখ দেখে যোগেশচন্দ্র রায় তার জন্মকাল ১৬০৪ খ্রিস্টাব্দ বলেছেন। আবার, ১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে নকল করা একটি পুঁথিতে কাশীরামের নাম পাওয়া গেছে। তাই নির্ভুল তারিখটি বেছে নেওয়া সম্ভব। বলা যায়, ষোড়শ শতকের শেষ ও সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে তার কাব্য লেখা হয়েছিল। 


কাশীরাম দাসের 'ভারত পাঁচালী':


কাশীরাম দাসের অনুবাদের নাম ভারত পাঁচালী। তিনি এটি শেষ করেছিলেন কিনা তা জানা যায় না। একটি পুঁথিতে পাওয়া গেছে, 

"আদি সভা বন বিরাটের কতদূর। 

ইহা রচি কাশীদাস গেলা স্বর্গপুর।।"


এই শ্লোকটি হয়তো প্রক্ষিপ্ত। তবে তিনি যে সম্পূর্ণ মহাভারতের অনুবাদ করে যেতে পারেননি তা নিশ্চিত। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র নন্দরাম এটি শেষ করেন। পুঁথিতে কোথাও কোথাও নন্দরামের ভনিতা পাওয়া গেছে। এমনও হতে পারে কবির বংশের অনেকের সমবেত চেষ্টায় এই অনুবাদ কর্মটি শেষ হয়েছিল। 


কাশীরাম দাসের কাব্যের বৈশিষ্ট্য:


কাশীরাম দাস বাঙালির চাহিদা ও রুচি অনুযায়ী মহাভারত কাহিনীর রূপান্তর ঘটিয়েছিলেন। বহু কাহিনী তৈরি করেছিলেন। বহু মূল কাহিনী বাদ দিয়েছিলেন বা সংক্ষিপ্ত করেছিলেন। বহু লোকপ্রিয় কাহিনী সংযোজন করেছিলেন। অর্থাৎ সংস্কৃত মহাভারতের যথাযথ অনুবাদ না করে ভাবানুবাদ করেছিলেন। এটি করে তিনি ঠিকই করেছিলেন। মধ্যযুগের মানুষ তাদের মানসিকতা অনুযায়ী যে কাহিনীগুলি পছন্দ করতেন, কাশীরাম তাদের সেই আকাঙ্ক্ষার মর্যাদা দিয়েছিলেন। সর্বোপরি তার কাব্যে যে বৈষ্ণবীয় বিনয়ের ধারা গড়ে উঠেছে তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায় কাশীরাম দাস চৈতন্য পরবর্তী যুগের বৈষ্ণব ভক্তির ধারায় স্নাত হয়েছিলেন। 


সপ্তদশ শতকে মহাভারতের অনুবাদ:


সপ্তদশ শতকের আর এক অনুবাদক নিত্যানন্দ ঘোষ। ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে তার কাব্য রচনা শেষ হয়। কাশীধামের কাব্যের সঙ্গে তাঁর রচনায় অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়। 


অষ্টাদশ শতকে মহাভারতের অনুবাদ:


অষ্টাদশ শতকে মহাভারতের কোন পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ হয়নি। অনেকে দু-একটি পর্বের অনুবাদ করেছেন মাত্র। এদের মধ্যে দ্বৈপায়ন দাস, কৃষ্ণানন্দ বসু, দ্বিজ গোবর্ধন, রাজারাম দত্ত উল্লেখযোগ্য। তবে এদের উপর কাশীরামের প্রভাব খুব বেশি। 


।। সমাপ্ত।।


logoblog

Thanks for reading Mahabharater Anubad Bangla Sahityer Itihas

Previous
« Prev Post

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Please do not enter any spam links in the comment box.